গাজীপুরে মসজিদ দখলে বহিরাগত ‘মাস্তান’, নেতৃত্বে যুবদল-ছাত্রদল নেতা !
স্বঘোষিত কমিটি, ইমামকে লাঞ্চিত
গাজীপুর প্রতিনিধি
গাজীপুরের বড়বাড়ি এলাকায় শতবর্ষী বায়তুল নূরে আকসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে যুবদল ও ছাত্রদলের দুই নেতার নেতৃত্বে ভাড়াটে বহিরাগতদের এনে জুমার দিনে ‘মসজিদ দখল’ এবং স্বঘোষিত কমিটি গঠনের অভিযোগ উঠেছে। সোমবার সকালে স্থানীয় একটি স্কুলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে, ওই দুই নেতার নেতৃত্বে টঙ্গীর এরশাদনগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বহিরাগতদের এনে মসজিদে হট্টগোল সৃষ্টি করে একতরফাভাবে কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে বহিরাগতদের নিয়ে ওই কমিটির নেতারা নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন। এ ঘটনায় স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও এলাকায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মসজিদে ঢুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বহিরাগতদের মধ্যে টঙ্গীর এরশাদনগর এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারিরাও ছিলেন। তাদের কয়েকজনের ছবি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, মসজিদ দখলে অংশ নেওয়া বহিরাগতদের বড় একটি অংশ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
সোমবার দুপুরে বড়বাড়ি এলাকায় বায়তুল নূরে আকসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওয়াক্ফ সম্পত্তির মোতাওয়াল্লি ফজলুল হক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন। এ সময় স্থানীয় মুসল্লি, মসজিদের দাতা পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, গাছা থানা যুবদলের নেতা সোলাইমান সরকার ও গাজীপুর মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসএম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বে গত শুক্রবার জুমার নামাজের আগে একদল বহিরাগত মসজিদে প্রবেশ করেন। তারা হট্টগোল শুরু করলে মসজিদের ইমাম সবাইকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করেন এবং কোনো বক্তব্য থাকলে নামাজের পর বসে আলোচনা করার আহ্বান জানান। এ সময় আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত আনোয়ার সরকার ইমামকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তাঁর হাত থেকে মাইক কেড়ে নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে তাঁকে ‘তুই কে’ বলে গালাগাল ও হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শী মুসল্লিরা।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, মসজিদে ঢুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের কেউই ওই মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি বা এলাকার বাসিন্দা নন। এমনকি স্বঘোষিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও এর আগে ওই মসজিদে নামাজ পড়তে দেখা যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, গত শুক্রবারই তাদের প্রথমবারের মতো ওই মসজিদে দেখা যায়।
স্থানীয় মুসল্লিরা আরও অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে মসজিদ পরিচালনা করে আসছিল। তাদের স্বঘোষিত কমিটি বাতিল করে মোতাওয়াল্লি নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন এবং আগের কমিটির কাছে মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়া হয়। এর পরই ওই পক্ষের ইন্ধনে বহিরাগতদের এনে মসজিদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং তাদের মাধ্যমে নতুন ‘স্বঘোষিত’ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, দাতা পরিবারের সদস্য, বর্তমান মোতাওয়াল্লি ও সাধারণ মুসল্লিদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে একতরফাভাবে ওই কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে গাছা থানা যুবদলের নেতা সোলাইমান সরকারকে সভাপতি এবং গাজীপুর মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসএম মোমিনুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ তারা কেউ ওই সমাজের বাসিন্দা নন। এমনকি তাদেরকে এলাকার কোন মসজিদেই নিয়মিত নামাজ পড়তে দেখা যায় না।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মসজিদ কমিটির সাবেক সভাপতি হাজী আবুল হাশেম সরকারের ছেলে ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুর আওয়াল সরকার বলেন, ‘কমিটি গঠনের বিষয়ে বর্তমান মোতাওয়াল্লি কিংবা দাতা পরিবারের কাউকেই ন্যূনতম অবহিত করা হয়নি। জুমার নামাজের পর এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খল পরিবেশে নতুন কমিটি করা হয়েছে। এ সময় ইমাম ও সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গে মারমুখী ও অশালীন আচরণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এই কমিটি বাতিল করে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের দাবি জানাচ্ছি। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন, পুলিশসহ প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
মোতাওয়াল্লি ফজলুল হক বলেন, নতুন কমিটির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। কমিটিতে থাকা ব্যক্তিরা স্থানীয় সমাজের কেউ নন। এ ছাড়া গত ১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত একটি পক্ষ মসজিদের নামে বিভিন্ন উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করলেও তার সঠিক হিসাব দেওয়া হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও গত দুই জুমায় পৃথকভাবে বহিরাগতদের এনে মসজিদে জোরপূর্বক কমিটি ঘোষণার চেষ্টা করা হয়েছিল। সর্বশেষ গত শুক্রবার জুমার নামাজের দিন বহিরাগতদের দিয়ে মসজিদে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ‘স্বঘোষিত’ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত যুবদল ও ছাত্রদল নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।





